বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৫৪ অপরাহ্ন৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

৩রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

সংবাদ শিরোনাম :
দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাচন ।। নৌকা প্রার্থী মোহাম্মদ আলী বিজয়ী, জামানত হারালেন বিএনপি দাউদকান্দিতে নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন বিরোধী বিট পুলিশিং সমাবেশ দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাচনে নৌকার গণজোয়ার সৃস্টি হয়েছে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে ——–মেয়র নাইম ইউসুফ সেইন বিএনপির সভায় ভোট চাইলেন আওয়ামীলীগ প্রার্থী দাউদকান্দিকে মডেল উপজেলায় রূপান্তর করতে নৌকাকে বিজয়ী করুন। —— মেজর (অব.) মোহাম্মদ আলী দাউদকান্দিতে ভিটামিন এ প্লাস কর্মসূচির উদ্বোধন দাউদকান্দির সুন্দুলপুর ইউপি চেয়ারম্যানের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর ৭৪তম জন্মদিন উদযাপন জাতীয় শোক দিবসে মেঘনা যুবলীগের আলোচনা সভা। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় যথাযোগ্য মর্যাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় শোক দিবস পালিত
রূপগঞ্জের ২০০ বছরের তাবিজ শিল্প বিলুপ্তির পথে

রূপগঞ্জের ২০০ বছরের তাবিজ শিল্প বিলুপ্তির পথে

রাসেল আহমেদঃ  দুপুর তখন ২টা। চারদিকে সুনশান নীরবতা। একপ্রান্তে দেখা গেলো ধূয়া উঠছে। কৌতুহলি হয়ে এগিয়ে যাওয়া। কাছের গিয়ে দেখা গেলো আগুনের কুন্ডলি। হঠ্যাৎ বিষয়টি দেখা অজানা অনেকে ভীমড়ি খাবে। ফুকনি দেখে মনে হবে হয়তো লোহা পুড়ছে। আর ডিম সাদৃশ্য বস্তু দেখে মনে হবে কোয়েল পাখির ডিম সেদ্ধ করছে। আসলে কুন্ডলির মধ্যে ডিম সাদৃশ্য মাটির ধলার ভেতরে তাবিজ পোড়ানো হচ্ছে। ২০০ বছর ধরে রূপগঞ্জের মুশরী, ভিংরাবো ও চোরাব এলাকার ১৫০ পরিবার লোহার তাবিজ তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তাবিজে ভাগ্যবদল হয় এমনটা তারা মনে করলেও এখানকার শত শত তাবিজ তৈরি কারিগরদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। আনুধিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঝাঁড়-ফুকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় তাবিজ ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে তাবিজের ব্যবহার না থাকায় ক্রমে ক্রমে এ ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। তবুও এর কদর রয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। রয়েছে ভারতের কামরু কামাখ্খা, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আর মিশরে।

স্থানীয় তাবিজ তৈরির কারিগরেরা বলেন, তাবিজ তৈরির ইতিহাস শত বছরের পুরনো। কারিগর শ্রীনাথ চন্দ্র সরকারের বাবা জগদীশ চন্দ্র সরকার মারা গেছেন ২২ বছর আগে। তখন তার বাবার বয়স ছিলো ৭০ বছর। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই তার বাবাকে দেখেছেন তাবিজ বানাতে। তার বাবার মুখে শুনেছেন তার দাদাও বানিয়েছে এ তাবিজ। শ্রীনাথ চন্দ্র সরকার বলেন, আজগা থেইক্যা ২০ বছর আগে আমাগো ব্যবসা চাঙ্গা আছিলো। অহন আগের মতন ব্যবসা নাই। এরপরেও হগলতে করে বাপ-দাদার আমলের ব্যবসা ধইরা রাখতে। শ্রীনাথ চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলার সময় ঘর থেকে বের হয়ে আসেন তার স্ত্রী প্রিয়াংকা বালা। অনেকটা আগ বাড়িয়ে বলেন, আমরা ডাইল-ভাত খাইয়া বাঁচপার পারতাম যদি সরকার আমাগো কারিগরগো একটু সহযোগীতা করতো।

স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, রূপগঞ্জের ডেমরা-কালীগঞ্জ সড়কের পাশ ঘেষেই রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মুশুরী গ্রাম। এছাড়া এর পাশ্ববতী ভিংরাব ও চোরাব গ্রামেই তাবিজ তৈরির কারখানাগুলো গড়ে উঠেছে। এ গ্রামগুলোর প্রায় সহ¯্রাধিক পরিবার এক সময় তাবিজ তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কালের বিবর্তনে বর্তমানে দেড়’শ পরিবার কোনোমতে টিকে আছে।

তাবিজ তৈরির কারিগর নিরঞ্জন, দিলীপ মন্ডল বলেন, আগে গ্রামেগঞ্জে তথা শহরেও রোগ-বালাইয়ের জন্য কবিরাজি দেখানো হতো। বিজ্ঞানের যুগের আবির্ভাবের ফলে কবিরাজি প্রথা নেই বললেই চলে। ফলে অনেক কবিরাজও তাদের কবিরাজি পেশা ছেড়ে দিয়েছে। কমে গেছে তাবিজের ব্যবহার। তবে দেশের অনেক এলাকায় এখনও কবিরাজীর প্রথা রয়ে গেছে। তাই অদ্ভুদ পেশার তাবিজ তৈরির কারিগরেরা পেটের তাগিদে ও বাপ-দাদার আমলের পেশাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে এ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। ব্যবসা মন্দার পাশাপাশি বেড়ে গেছে তাবিজ তৈরির কাচামালের দাম। কাচামাল বিক্রি হয় পণ হিসাবে। আগে এক কাউন কাচামালের দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। এখন কিনতে হয় ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। তারা বলেন, একটা তাবিজ বানাইতে অনেক কষ্ট। ১৯ বার তাবিজ ধরতে অয়। তারপরেই একটা তাবিজ হয়।

কারিগর সুখেন দাস, মিঠুন দাস, সুবল দাস বলেন, দেশের চাহিদা মিটিয়ে রূপগঞ্জের তাবিজ ভারতের কামরু কামাখ্খা, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, পাকিস্তান, ইরাক-ইরান, ও সৌদিতে যাচ্ছে এখানকার তাবিজ। দেশের নোয়াখালী, চিটাগাং, সিলেট, নরসিংদী ও কুমিল্লায় রয়েছে তাবিজের চাহিদা। কারিগরদের নিকট থেকে মহাজনরা তাবিজ কিনে নিয়ে বিক্রি করে চকবাজার ও মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে। সেখান থেকে চলে যায় বিভিন্ন দেশে ও দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

বিজ্ঞানের তৈরি ইসিজি, এক্সরে, প্যাথলজি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের যুগেও তাবিজের কদর কমেনি। মান্ধাতার আমলে গাও-গেরামের এমনকি শহরেও কবিরাজদের আসক্তি ছিল। রোগবালাই, ভালবাসার মানুষকে বশীকরণসহ বিভিন্ন কাজে কবিরাজরা তাবিজ-তুমার দিতো। এখন তাবিজ-কবজকে বিশ্বাস না করলেও এর ব্যবহার কমেনি। শিশুদের চোরায় ধরা, বান মারা, জাদুটোনা করা ও মনের মানুষকে কাছে পেতে এখনও মানুষ কবিরাজ ও মৌলভীদের কাছ থেকে তাবিজ নিয়ে থাকে।

মোডা ভাত আর মোডা কাফর জুটছে। কই! একবারে খারাপ নই। ঘর বানাইছি। গাভী কিনছি। খারাপ কই বাপ। কথাগুলো বললেন কারিগর গৌরাঙ্গ দাস। গৌরাঙ্গ দাসের মতো এসব এলাকার প্রায় দেড়’শ পরিবার এখন খেয়ে-পড়ে আছেন। টান মুশুরী এলাকার সত্তোর্ধ্ব নারায়ণ অধিকারী কাপা কাপা গলায় বলেন, ব্য-ব-সা অয় বাপ। খাইয়া-পইড়া আছি আরকি ? মহিলা কারিগর কুঞ্জুমালা বলেন, দাদাগো ভগমানে ভালাই রাখছে। দুইডা পোলাপান পড়াইতাছি, খাইতাছি আর কি লাগে। তবে কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে হতাশার চিত্রও দেখা গেছে।
মহাজন রমেশ চন্দ্র, হরিচন্দ সরকার, ফুলচান সরকার, দীলিপ সরকার, সুদন সরকার, চান মিয়া, বিজয় অধিকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, একসময় এখানকার লোহার তাবিজের অনেক কদর আছিলো। এখন ব্যবসা মন্দা।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





themesba-zoom1715152249
© "আমাদের দাউদকান্দি" কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
Developed By: Nagorik IT