রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন১৫ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১৫ই রজব, ১৪৪২ হিজরি

সংবাদ শিরোনাম :
নাইম ইউসুফ সেইনের হাসানপুরের পথসভা জনসভায় রূপ দাউদকান্দিতে প্রথম করোনার টিকা নেবেন উপজেলা চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) মোহাম্মদ আলী সুমন দাউদকান্দিতে নৌকায় ভোট চাইলেন জেলা যুবলীগ প্রচারণায় ব্যস্ত মেয়র প্রার্থী নাইম ইউসুফ সেইন দাউদকান্দিতে আ’লীগের মেয়র প্রার্থী নাইম ইউসুফ সেইনের গণসংযোগে মানুষের ঢল মেঘনায় যুবলীগ নেতা মুজিবুর রহমানের শীতবস্ত্র বিতরণ দাউদকান্দিকে মডেল পৌরসভায় রূপান্তরিত করতে নৌকায় ভোট দিন : ——–নাইম ইউসুফ সেইন দাউদকান্দি পৌরসভায় প্রতীক বরাদ্দে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু গৌরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ভিপি সালাউদ্দিন রিপনের প্রস্তুতি সভা দাউদকান্দি পৌরসভায় ফের নৌকার মাঝি হলেন নাইম ইউসুফ সেইন

মদের গ্রাম !

রাসেল আহমেদঃ পূর্বাচল উপশহর। সব কিছুতেই যেনো পূর্বাচল। পূর্বাচল অমুক সিটি-তমুক সিটি। পূর্বাচল রেস্টুরেন্ট, পূর্বাচল মার্কেট। তাই পূর্বাচল নামটি এখন ব্রান্ড। বলা হচ্ছে দেশের আধুনিক রাজধানী। কবে গড়ে উঠবে সেটা সন্দিহান। তবে ‘পূর্বাচল’ শব্দটি ব্যবহার করেই গড়ে উঠছে নানা অপরাধী ও অপরাধ চক্র। নীরব-নিস্তব্ধ ও প্রায় জনশূণ্য পূর্বাচল এখন অপরাধীদের অভয়াশ্রম। চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের পাশাপাশি বেওয়ারিশ লাশের নিরাপদ ঠিকানা এ পূর্বাচল। নানা অপরাধের পাশাপাশি পূর্বাচলে এখন তৈরি হয় ‘চোলাই মদ’। পূর্বাচলের কয়েকটি গ্রামের গহীন বনে রীতিমতো চোলাই মদের কারখানা গড়ে উঠেছে। এখানকার ৩৯ টি কারখানায় মাসে প্রায় ৩ লাখ লিটার মদ তৈরি হয়। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা। এসব গ্রামে চোলাই মদ তৈরি হওয়ার কারণে স্থানীয়রা গ্রামগুলোকে ‘মদের গ্রাম’ বলেই বেশি চেনেন। এ গ্রামগুলোতে অপরিচিত লোকজনদের প্রবেশেও রয়েছে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। অপরিচিত লোকজনের গতিবিধি লক্ষ্য রাখতে পোষা হয় পাইক-পেয়াদা। এসব পাইক-পেয়াদা অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখা মাত্রই মদের কারবারীদের সতর্ক করে দেন। গত ৩০ বছর ধরে চলে আসা এ গ্রামগুলোতে চোলাই মদ তৈরি হয়ে আসলেও চোখে পড়ার মতো তেমন কোন অভিযান পরিচালনা হয়নি। তবে পুলিশ-প্রশাসন দূর্গম এলাকা আখ্যা দিয়ে নিজেদের দায় এঁড়িয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, গুচ্ছগ্রাম। রূপগঞ্জ থানার শেষ সীমানা। আর কালীগঞ্জ থানার শুরু। গ্রামটির একপাশে বালু নদ। আর একপাশে গজারী বন। অন্যপাশে সাত-আট ফুট চওড়া খাল। কার্যত বিচ্ছিন্ন ব-দ্বীপ হিসাবে পরিচিত এই গ্রামটি নারায়নগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রাম। এ গ্রামের সব পরিবারের পেশা হয়ে উঠেছে অবৈধভাবে চোলাই মদ তৈরি। শুধু গুচ্ছগ্রামই নয়। এখন গোবিন্দপুর, ধামচিসহ আর কয়েকটি গ্রামে এ ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের দুর্গম এলাকা গুচ্ছগ্রাম, গোবিন্দুপুর, ধামচি এলাকায় ৩৯ টির উপড়ে চোলাই মদ তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় প্রতিমাসে প্রায় ৩ লাখ লিটার মদ তৈরি হয় বলে জানা গেছে। যার আনুমানিক মূল্য ৭ কোটি টাকা। গ্রামগুলোতে বসবাসরত ৬৫ টি পরিবারই কোনো না কোনোভাবে মদের কারবারের সঙ্গে জড়িত। এসব মদ রূপগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় যায়। পরে ঐসব বিক্রেতারা ৬’শ থেকে ৭’শ টাকা লিটারে বিক্রি করে বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, মদের কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পায় থানা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অনেকেই।
সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে তৎকালীন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় সরকার ভূমিহীন লোককে গুচ্ছগ্রামে এনে পুর্নবাসন করে। গ্রামটিতে ঢুকলেই ভয়ে গা ছমছম করে উঠবে। চারদিকে নীরব-নিস্তব্ধ। মনে হবে গ্রামটিতে যেন কোনো মানুষ নেই। গ্রামটির একপাশে বালু নদ। আর একপাশে গজারী বন। এ বন পার হলেই গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার কাচকুড়া, পারাবরতা, বরকাউ গ্রাম। অন্যপাশে সাত-আট ফুট চওড়া একটি খাল। পুলিশ-প্রশাসনসহ যে কাউকে গ্রামটিতে যেতে হলে এই খালটি পার হতে হয়। মাদক কারবারিরা আত্মরক্ষার জন্য নিজেরা এই খাল কেটেছে বলে স্থানীয়রা জানায়। এছাড়া তারা আশপাশে পাহারাদার রাখে, যেন অনাকাঙ্খিত কেউ গ্রামে ঢুকতে না পারে। রূপগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে উত্তরে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের এই গুচ্ছগ্রামে যেতে এশিয়ান হাইওয়ে সড়ক থেকে কমপকক্ষে দুই কিলোমিটার হেটে যেতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, এখানে নেই মসজিদ। নেই স্কুল। নেই কবরস্থান। বংশানুক্রমে সবাই মদের কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৭ বছর আগে গুচ্ছগ্রামে মদের কারবার শুরু হয়। এর আগে তারা কেউ সবজি বিক্রি, কেউ দিনমজুর আর কেউবা ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত ছিল। এসব মদের কারবারীরা একসময়কার মদের গ্রাম বলে খ্যাত উপজেলার ভোলানাথপুর গ্রামের মদের কারবারীদের কাছ থেকে মদ তৈরি করার নিয়ম রপ্ত করেছে। ১৯৯৬ সালের দিকে ভোলানাথপুরের ২০ টি কারখানায় চোলাই মদ তৈরি হতো। এরপর পূর্বাচল উপশহরের জন্য রাজউক কতৃপক্ষ তাদের উচ্ছেদ করে দেয়। ২০০৭ সালের দিকে গুচ্ছগ্রামের বেদন মিয়া প্রথমে মদের কারখানা তৈরি করে কারবার শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে ফুলে-ফেপে ওঠে গুচ্ছগ্রামের মদের কারবার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চোলাই মদ তৈরির উপকরণ চিটাগুড় সাপ্লাই দেয় ইছাপুরা এলাকার সোহেল নামে এক ব্যবসায়ী। পরে এসব চিটাগুড়সহ আরো উপাদান আগুনে জ্বাল দিয়ে চোলাই মদ তৈরি করা হয়। যার সঙ্গে মেশানো থাকে স্পিরিট। মদ জ্বাল দেওয়া হয় গুচ্ছগ্রামের সবজি মাচার নিচে। সবজি মাচার নিচে চুলা তৈরি করে ড্রামের মধ্যে চিটাগুড় জ্বাল দেওয়া হয়। পরে জ্বাল দেওয়া চিটাগুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে ড্রামে ভরে সবজি মাচার নিচে গর্ত করে মাটির তলে রেখে দেওয়া হয়। প্রায় ৫/৬ দিন পচানোর পর তা পরিশোধন করে চোলাই মদ তৈরি করা হয়। এরপর তৈরি করা মদের সঙ্গে পানি মিশিয়ে গ্যালনে ভর্তি করা হয়। একপর্যায়ে তা ইছারমাথা( ট্রাক্টর) ও ইঞ্জিন চালিত ট্রলারের মাধ্যমে রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক এলাকায় পৌছায়। গুচ্ছগ্রাম ছাড়াও রূপগঞ্জের গোবিন্দপুর, ধামচি, কালীগঞ্জের বাশাবাশি, কাচকুড়া ও পারাবরতা এলাকায় চোইল মদের কারখানা গড়ে উঠেছে। এছাড়া রূপগঞ্জের রাতালদিয়া এলাকার ছলে বেগম ও নয়ামাটি এলাকার কবির হোসেন চোলাই মদের কারখানা গড়ে তুলেছে বলে জানা গেছে।
গোবিন্দপুর এলাকার ( বর্তমানে পূর্বাচলের ২৩ নং সেক্টর} বেশ কয়েক স্থানে দেখা যায়, জলন্ত চুল্লি মদ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে।শুধু তাই নয়; প্লাস্টিক ড্রামে মণের মণ মদ ও এর কাঁচামাল মাটির তলায় পুতে রাখা রয়েছে। আগন্তক কেউ যেনো বুঝতে না পারে সেজন্য ড্রামের উপড়ে কৌশলে লাকড়ী, ঘাস বিঁছিয়ে রাখা হয়েছে।
মাদক ব্যবসায়ীদের ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গুচ্ছগ্রামে বেদন মিয়াই রয়েছে ৪ টি কারখানা। তার বিরুদ্ধে ১৮ টির মতো মাদকদ্রব্য আইনে মামলা রয়েছে। এছাড়া গ্রামের রাশিদুল, জাইদুল, আলতাব, কাইয়ুম, নাইয়ুম, বিল্লাল, হান্নান, ইউনুস আলী, মোতলা মিয়া, মিয়াজদ্দিন, টিটো, ডালিম, শরীফ ভূইয়া, জহিরুল, আবদুল হামিদ, হাসান, নুর আলম, মাসুদ, সোহেল, আনোয়ারসহ প্রায় সবাই মদের কারবারে জড়িত। সূত্রটি জানায়, প্রায় ৩৫ টি কারখানায় প্রতিমাসে ২ লাখ লিটার মদ তৈরি হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৬ কোটি টাকা। এসব অবৈধ টাকার ভাগ পায় থানা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, স্থানীয় মাস্তান , রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী । স্থানীয়রা জানান, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা কালেভ্রদ্রে এখানে অভিযান চালায় অনেকটা লোক দেখানো। পুলিশি অভিযানের সময় মাদক কারবারীরা গা-ঢাকা দেয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে আবার শুরু হয় নতুন করে কারবার। মদের কারবারের সঙ্গে জড়িত বেদন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগে ব্যবসা করছি, তয় অহন করি না। ব্যবসা করনের সময় পুলিশসহ হগলতে টেকা পাইতো। টেকা কম অইলেই আমাগো ধড়পাকড় করে। চিটা গুড় ব্যবসায়ী সোহেলের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ভাই এই মিডাই গরুরে খাওনের লেইগ্যা। এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেদনরা কিনা নিয়া কি করে হেইডাতো আমি জানি না। আমার বেচবার দরকার বেচি। অভিযুক্ত চোলাই মাদক কারবারি শফিকুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি মাদক কারবার করি না। তবে মাঝে মধ্যে শুধু চুল্লি করে জ্বাল দেই। এসব নিয়ন্ত্রণ করে অন্যরা। তাদের নাম বলা সম্ভব নয়।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, পুলিশ টাকা পায় এটা মিথ্যা কথা। আমার কোন পুলিশ সদস্য যদি টেকা নেয় আর এর প্রমাণ মিলে তাহলে ব্যবস্থা নিবো। র‌্যাব-১ এর (সিপিসি ৩ পূর্বাচল) কমান্ডার মেজর আব্দুল্লাহ আল মেহেদী বলেন, পূর্বাচল নির্জন স্থান। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েই নানা অপরাধের ঘটনা ঘটছে। শীঘ্রই এসব ব্যাপাওের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারায়ণগঞ্জ গ-সার্কেল (রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার) সহকারী পুলিশ সুপার মাহিন ফরাজি বলেন, মাদকের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স। সুতরাং মদের কারখানা গুড়িয়ে দেওয়া হবে অচিরেই।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





error: Content is protected !!
themesba-zoom1715152249
© "আমাদের দাউদকান্দি" কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
Developed By: Nagorik IT
error: Content is protected !!