অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদকে যেমন দেখেছি যেমন জেনেছি


প্রকাশের সময় : আগস্ট ২৩, ২০২১, ৩:৪১ অপরাহ্ণ
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদকে যেমন দেখেছি যেমন জেনেছি

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদকে কাছ থেকে যেমন দেখেছি, যেমন জেনেছি। তিনি ছিলেন একজন মার্কসবাদী সাচ্চা কমিউনিস্ট। প্রজ্ঞাবান অভিসংবাদিত নেতা। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং স্মরণ শক্তি ছিল খুবই প্রকোট। নিজের এবং গ্রামের নাম বললেই বাপ- দাদার নাম বলে দিতে পারতেন, তুমি ওমকের ছেলে বা ওমকের নাতী। সব সময় গ্রাম্য সাবলিল ভাষায় কথা বলতেন। ওনাকে সবাই স্যার বলে সম্ভোধন করলেও ছোটবেলা থেকেই দাদা বলে ডাকতাম। তিনি যখন তার গ্রামের বাড়িতে আসতেন তখন ওনার সাথে দেখা করতে এবং নানা মুখরোচক কথা শুনার জন্য যেতাম।
একবার আমার এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে দাদা(অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ)’র সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বন্ধুর পরিচয় জানতে চাইলে বললাম, সে দেবীদ্বার সদরের সাইলচর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত জেল সুপার সুজাত আলী সরকারের ছেলে। দাদা উপস্থিত সবাইকে ডেকে দৃষ্টিআকর্ষণ করে বললেন, দেখ তোমরা বাশার আমার সাথে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে, হাইলচরের সাব জেলার সুজার পুতেরে পরিচয় করিয়ে দিয়ে- সারা জীবন যে গ্রামকে হাইলচর বলে চিনি সে গ্রামকে শুদ্ধ ভাষায় সাইলচর বলেছে।
একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলাম দাদা আপনি রাজনীতি করেন মার্কবাদী দর্শনের, আপনার রাজনৈতিক গুরু কমরেড মোজাফ্ফর, কমরেড নেপাল নাগ, কমরেড মনিসিংহ। রাজনৈতিক আলাপ চারিতায় কথায় কথায় তাদের চেয়ে বেশী উদাহরণ টানেন মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সহরোয়ার্দী, একেএম ফজলুল হককে নিয়ে। ওনারা যদি এত বড় বড় নেতাই হতেন, তাহলে ওনাদের মৃত্যুর পর ওনাদের রাজনৈতিক দলগুলো মৃতপ্রায় কেন ? জবাবে তিনি বললেন,- তুমি কি সাংবাদিক হিসেবে নাকি রাজনীতিক হিসেবে জানতে চাও ? বললাম দু’টোর সাথে যেহেতু সম্পৃক্ত দুটোর আলোকেই জানতে চাই। তখন তিনি রাগান্বীত হয়ে বললেন, আমি তোমার চেয়ে বড় বড় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে জেনে নেই মার্কসবাদের উপর তার কতটুকু লেখাপড়া আছে, এবার কলম পকেটে নাও, তুমি কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হতে পার তবে মার্কসবাদের উপর তোমার লেখাপড়া কম। তুমি কমরেড হতে পারনি, এখনো তুমি কমরেটের মানুষই রয়ে গেলে। আজ থেকে তোমার ‘বাশার’ নামের দু’টি আকার কেটে ‘বশর’ বলে ডাকব। আমৃত্যু তিনি আমাকে কমরেড ‘বশর’ বলেই ডেকেছিলেন। এলাকার কেউ ওনার ঢাকার বাসায় দেখা করতে গেলে আমার খোঁজ খবর নিতেন, বলতেন কমরেড বশর কেমন আছে। ফোনে বা কখনো কোন প্রয়োজনে চিরকুট পাঠালে তাতেও লিখতেন কমরেড ‘বশর’ শুভেচ্ছা নিও, কেমন আছ ?
ঘটনাবহুল বিশ্বব্যবস্থায় এ মহান নেতার (অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের) রাজনৈতিক দর্শন, চিন্তাধারা ও দূরদর্শিতা বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী বলে শুধুমাত্র জাতীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও প্রমাণিত হয়েছে। দেশপ্রেমে জাগ্রত রাজনৈতিক কর্মী সৃষ্টির প্রয়াসে মদনপুরে তার প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের একমাত্র শিক্ষায়তন ‘সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমুহূর্তে প্রায় নিষ্ক্রিয় এবং বিভক্ত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) একাংশের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর নিজেকে ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল- গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রবাদপ্রতিম এ ব্যক্তিত্ব নিজেকে সাদামাটাভাবে উপস্থাপন করতে ভালোবেসেছেন আজীবন। অধ্যাপক আহমদ ব্যক্তিজীবনে কথাবার্তা বলতেন কিছুটা কৌতুকমিশ্রিতভাবে; কখনো থাকে প্রচ্ছন্ন হেঁয়ালির ছোঁয়া।
এ নেতা নিজের পরিচয় দিয়ে বলতে আমি মোজাফ্ফর আহমেদ নুরী, পথে পথে ঘুরি। দরিদ্র মানুষের অবস্থান তুলে ধরতে যেয়ে বলতেন,- ‘ভর্ত্তার নিচে তরকারী নাই, নেংটির নিচে কাপড় নাই, চকিদারের নিচে চাকরী নাই।’ এ উক্তিগুলো এখনো গ্রাম বাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ রাজনীতি নিয়ে বলেছেন,- ‘রাজনীতি ব্যবসা নয়, পেশাও নয়। রাজনীতি একটি ওয়াদা। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল মানুষের সেবা করা। রাজনীতির মুল ভিত্তি হল স্বদেশের প্রতি মমত্ববোধ, দেশের কল্যানে ও জনগনের সার্র্বিক কল্যানে অবিরাম সংগ্রাম করে যাওয়া, যে কোন ত্যাগ নিমিত্তে সদা প্রস্তত থাকা’। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ ২০১৫ সালে প্রাপ্ত ‘স্বাধীনতা পদক’ বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘কিছু পাওয়ার জন্যে স্বাধীনতা যুদ্ধ করিনি। রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই।’

বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতিতে আলো ছড়ানো অনন্য ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিবনগর (প্রবাসী) সরকারের উপদেষ্টামন্ডলীর অন্যতম উপদেষ্টা, ১৯৭১-এ ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন’র যৌথ উদ্যোগে গঠিত বিশেষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)’র সভাপতি জননেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ’র আজ ২৩ আগষ্ট দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি দির্ঘ রোগ ভোগের পর ২০১৯ সালের এই দিন রাত ৭টা ৪৯মিঃ ঢাকা এ্যাপলো হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ’

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামের সম্ভ্রান্ত ভূইয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা স্কুল শিক্ষক আলহাজ¦ কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মা আফজারুন্নেছা।

তিনি দেবীদ্বার উপজেলার হোসেনতলা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেনী, দেবীদ্বার রেয়াজউদ্দিন মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৩৯ সালে মেট্টিক ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আই.এ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ইউনেস্কোর ডিপ্লোমা লাভ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করার আগে চট্রগ্রাম সরকারী কলেজ ও ঢাকা কলেজ সহ বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।

কিন্তু শিক্ষকতা পেশা তাকে বেশি দিন আটকে রাখতে পারে নি। তিনি শোষিত, নিপিড়িত, নির্যাতি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেেেড় চলে আসেন জনগণের কাতারে। ১৯৩৭ সালে তার রাজনৈতিক জীবনের হাতে খড়ি। যদিও সক্রিয়ভাবে (চাকুরি ছেড়ে দিয়ে) রাজনীতিতে আসেন ১৯৫৪ সালে। তখন তিনি দেবীদ্বার আসন থেকে মুসলিম লীগ থেকে মনোনীত সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী খান বাহাদুর কায়দে আযম মৌলভী মফিজ উদ্দিন আহমদকে পরাজিত করে প্রথম বারের মত এমপি নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে তিনি পূনরায় জাতীয় সংসদের সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৮১ সালে ন্যাপ, সিপিবি এবং প্রগতিশীল শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন।

চল্লিশের দশকে যারা ছাত্রাবস্থায় বামপন্থায় দীক্ষা নিয়েছিলেন, মোজাফফর আহমদ তাঁদের একজন। হয়ে পড়েন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মোজাফফর আহমদের একনিষ্ঠ অনুসারী। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনকালে তাঁর আজিমপুর কলোনির ৮/আই, নাম্বারের বাসায় নিষিদ্ধঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির নিয়মিত বৈঠক করতেন। তৎকালিন কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দদের মধ্যে কমরেড নেপাল নাগ, কমরেড খোকা রায়, কমরেড মনিসিংহ, কমরেড অনিল মুখার্জি, কমরেড সত্যেন সেন অন্যতম। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

কুঁড়েঘর প্রতীক খ্যাত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী বাম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর রংপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এক কাউন্সিল অধিবেশনের পর চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী-এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। চীনপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন মাওলানা ভাসানী এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল ওয়াালী খান। মস্কো শিবিরে পূর্ব পাকিস্তানপন্থী ন্যাপের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এ অংশ মোজাফফর ন্যাপ নামেও পরিচিত ছিল। ১৯৬৯-এ আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের কারনে গ্রেফতার হন। ১৯৭১‘র স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান নেতৃত্বের অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ওই সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।

তিনি বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, ভারত, লিবিয়া, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ সফর করেন।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী বয়োজৈষ্ঠ্য বাম নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বার্ধ্যক্যের কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই অবসরে ছিলেন। বার্ধক্য জনিত নানা শারিরীক সমস্যা বাসা বেধেছিল তার দেহে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। এদলটির নেতৃত্ব ছিলেন বর্ষিয়ান নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ।

তার রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বর্নিল। ১৯৩৭ সালে মাত্র ১৫ বছরের কিশোর বয়স থেকেই তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে কুমিল্লা জেলার চান্দিনা গরুবাজারে বৃটিশ হটাও আন্দোলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত এক জনসভায় মহত্মা গান্ধী ভাষন দেয়ার সংবাদে গান্ধীকে দেখার জন্য অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ ওই সভায় বাড়ি থেকে পায়ে হেটে যোগদান করেন। তখন তার ধারনা ছিল একটি জাতীয় পোকা গান্ধীজী দেখতে কেমন। যখন দেখলেন গামছা পড়া লাঠি ভর করে এক ব্যক্তি (গান্ধীজি) মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিচ্ছেন,- ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই হো- এক হো, বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাকো খতম কর’ আহবান জানিয়ে আরো দু’একটি কথা বলেই তিনি বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে যান থকণ তিনি অবাক হলেন, এতোবড় নেতা যাকে দেখতে এলাম, বক্তৃতা শোনতে এলাম তিনি একটি উপদেশমূলক আহবান জানিয়ে চলে গেলেন ! সেই মর্মার্থ খুঁজতে যেয়ে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে একজন সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘোষণা দিলে তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, ‘রাজনীতির অর্থ দেশ এবং মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করেননি তিনি। পদক দিলে বা নিলেই যে মানুষ সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি বিশ্বাসী নন।’
১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আমবাগানে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন হয়ে যায়। দেশের রাজধানী হল এই মুজিবনগর। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ স্বাধীনতা সংগ্রামের মুল নেতৃত্বও কেবল একজন গুরুত্বপূর্ন মুক্তিযোদ্বাই ছিলেন না; একই সঙ্গে তিনি ১৯৭১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য। ওই কমিটির সদস্যরা হলেন,- আহবায়ক- তাজউদ্দিন আহমেদ(আওয়ামী লীগ), সদস্য- খন্দকার মোশতাক আহমদ(আওয়ামী লীগ), সদস্য- মাওলানা আবদুল হামিদ খান (ন্যাপ ভাসানী), সদস্য- অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ (ন্যাপ(মোজাফ্ফর), সদস্য- মনোরঞ্জন ধর (জাতীয় কংগ্রেস), সদস্য- কমরেড মনি সিংহ (কমিউনিষ্ট পার্টি)। এই সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই আজ পরপারে; সর্বশেষ অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ’ই প্রায় শত বছরের সাক্ষী হিসাবে আমাদের মধ্যে বেঁচে ছিলেন। মুক্তিযুদ্বের সময় তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সর্মথন আদায়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন এবং সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন ।

তিনি বাঙ্গালীদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন আদায়ের লক্ষে বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে যোগদান করা করেন। এছাড়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করেন। ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব করা হলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রদান করে। ৫ ডিসেম্বর একই প্রস্তাব আনা হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ২য় বার ভেটো দেয়। এসময় “তাস” মারফত এক বিবৃতিতে সোভিয়েট সরকার “পূর্ব বাংলার জনগণের আইন সঙ্গত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সঙ্কট নিরসনে রাজনৈতিক সমাধানের দাবী জানানো হয়। আমেরিকা যখন দেখল যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেছে তখন পাকিস্তানের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ৯ ডিসেম্বর নির্দেশ দেয়া হলে ১২ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরে ৭ম নৌবহর প্রবেশ করলে সোভিয়েট ইউনিয়ন একটি অত্যাধুনিক অষ্টম নৌবহর পাঠায়। এসংবাদ পেয়ে ৭ম নৌবহর পিছু হটে যায়।

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার,
সাংবাদিক, লেখক, রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।
সভাপতি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কুমিল্লা জেলা কমিটি।

শেয়ার করুন
error: কপিরাইট এর আওতাধীন!!